করেছি আপিসের বড়বাবুটি হয়ে, বে-থা করে নিশ্চিন্তে ছেলের মাথায় হাতটি রেখে মরে যাওয়ার জন্য। দূরভিসারী চিত্ত আমাদের নয়, কঠিনের সাধনাকে আমরা ভয় করি। তাই প্রেমকে ভয় করি, মহত্ত্বকে ভয় করি, জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ভয় করি। মৃত্যুর পরে যার তহবিলে কিছু টাকাপয়সা পাওয়া যায়, সে ব্যক্তিই আমাদের কাছে সার্থক মানুষ, তারই প্রশংসায় আমরা পঞ্চমুখ। আমাদের ছেলেদের তারই চরিত্র অধ্যয়ন ও অনুসরণ করতে বলি।
ভুলে যাই যে, অন্তরের দিক দিয়ে যে যতবেশি ছোট, তার তত বেশি টাকাপয়সা জমাবার সম্ভাবনা। ছোটলোকমির সাধনাই আমাদের কাছে জীবন-সাধনা হয়ে দাড়ায়। নীতি এ সাধনার সহায়ক, একটা ধরাবাধা পদ্ধতির অনুসরণ না করলে আর যাই করা যাক টাকাপয়সা করা যায় না। তাই আমরা নীতিধর্মী হয়েছি।
কথায় কথায় হিন্দুর উন্নতি-অবনতির কথা এসে পড়ল। ভালোই হল, কথায় বলে নসিহতের চেয়ে নজির ভালো। আর এ নজিরে বিপদের সম্ভাবনা কম। কারণ, আর যে-কারণেই হোক ধর্মের সমালোচনায় হিন্দু, অন্তত বাঙালি হিন্দু, উদণ্ড হয় না। ধর্ম ব্যাপারে পাশাপাশি বিভিন্ন মতবাদ চলার দরুন সে অনেকখানি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা অর্জন করেছে।
ধাৰ্মিক আর কালচার্ড মানুষে আরেকটা লক্ষ্যযোগ্য পার্থক্য এই যে, ধর্মিকের চেয়ে কালচার্ড মানুষের বন্ধন অনেক বেশি। উলটা কথার মতো শোনালেও, কথাটি সত্য। ধার্মিকের কয়েকটি মোটা বন্ধন, সংস্কৃতিবান মানুষের বন্ধনের অন্ত নেই। অসংখ্য সূক্ষ্মচিন্তার বাধনে যে বাধা সে-ই তো ফ্রি-থিংকার আর ফ্রি-থিংকিং কালচারের দান। যেখানে ফ্রি-থিংকিং নেই সেখানে কালচার নেই। প্রশ্ন হবে : ধৰ্ম আর কালচারকে যেভাবে আলাদা করে দেখা হল তাতে মনে হচ্ছে নাকি ধাৰ্মিক কখনো প্রকৃত অর্থে কালচার্ড হতে পারে না? কিন্তু কথাটি কি সত্য? ধামিকদের মধ্যেও তো অনেক কালচার্ড লোক দেখতে পাওয়া যায়। উত্তরে বলব : তা বটে, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই টের পাওয়া যাবে, সেখানেও কালচারই কালচার্ড হওয়ার হেতু। অনুভূতি, কলপনার সাধনা করেছেন বলেই তারা কালচার্ড, অন্য কারণে নয়।
একটা অভিজ্ঞতার সহায়তায় আমি কথাটা পরিষ্কার করবার চেষ্টা করছি। আমি মিলিটারি কন্ট্রাকটারের খাতায় নাম লেখানোর দরুন পাদরি ওয়াটসন সাহেব যা বলেছিলেন তা এখানে মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন : কবিত্বের প্রবণতাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে কন্ট্রাকটার, বিশেষ করে মিলিটারি কন্ট্রাকটার হওয়া অপরাধ, মহাঅপরাধ। নিজের প্রতিভাকে মরতে দেওয়া আর নিজের আত্মাকে মরতে দেওয়া এক কথা। তুমি নিজেকে মরতে দিতে পার, কিন্তু নিজের আত্মাকে মরতে দিতে পার না। যে-পেশা গ্রহণ করলে তোমার সূক্ষ্ম অনুভূতি ও সৌন্দর্যবোধ ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা, তুমি সে পেশা গ্রহণ করেছ শুনে আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি চাই তুমি ন-খেয়ে মরো তথাপি তোমার সূক্ষ্মানুভূতিকে বঁচিয়ে রাখো, কেননা সূক্ষ্মানুভূতিরই অপর নাম আত্মা। তুমি বলবে তোমার সামান্য প্রতিভা, আর little genius is a great bondage—সামান্য প্রতিভা, কঠিন বন্ধন। কিন্তু সামান্য হলেও তা মূল্যবান। আর যা মূল্যবান তার যত্ন না-নেওয়া মহাপাপ। বুঝলে ? কথায় বলে, ভালো লোকদের ভাত নেই। তোমার ভাত না থাক, কিন্তু ভালোও বজায় থাক, এই আমার কামনা।
তখন মার্ক্সের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ হয়নি। তাই কথাটা শুনে খুশি হয়ে ঘরে ফিরে এলাম, কোনো তর্ক না করে। এখনো মাঝে মাঝে আমার সেই বোকামিকে আমি চুমু খাই। কেননা, আমি জানি খুশি হওয়ার জন্যে বোকা হওয়ার প্রয়োজন আছে। বাইবেলের ভাষাটা একটু বদলে দিয়ে বলা যায়: Blessed are the simple hearted for they shall he happy.”
এখন এই যে মূল্যবোধ, এই যে সূক্ষ্ম অনুভূতি আর আত্মাকে এক করে দেখার প্রবৃত্তি— এ-কি ধর্মের দান, না কালচারের কীর্তি? কই সচরাচর তো ধাৰ্মিকের মুখে এ-ধরনের সুদর কথা শুনতে পাওয়া যায় না। তার কাছে তো আল্লার হুকুম আর বেহেশত দোজখই বড় হয়ে ওঠে, সূক্ষ্ম অনুভূতির কথা নয়। সূক্ষ্ম অনুভূতি কালচারের দান। Human value সম্বন্ধে কালচারই মানুষকে সচেতন করে। তবে কালচার্ড মানুষ ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করে কেন? উত্তর, আরামের জন্য। একটা বিশ্বাসের আরাম-কেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে সহজে জীবন যাপন করা যায় বলেই তিনি তা করেন। যে ধর্মকে তিনি আশ্ৰয়রূপে গ্রহণ করেন তাতে তিনি নিজেরই কালচার্ড মনের প্রতিবিম্ব দেখতে পান, এবং দেখতে পেয়ে ঘোষণা করে বেড়ান : দেখো, দেখো এখানে সব আছে, এখানে এসো, কালচার্ড মনের উপযোগী ধর্ম যদি কোথাও থেকে থাকে তবে তা এখানে, এখানে, এখানে —ব্যাপারটা যে মোটের ওপর তারি মনের প্রতিফলন, বাইরের তেমনি কিছু নয়, তা তিনি টের পান না। প্রেমিক যেমন নিগ্রো মেয়ের ভুরুতেও হেলেনীয় সৌন্দর্য দেখতে পেয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকে, এখানেও তেমন একটা ব্যাপার ঘটে। তা তিনি মুগ্ধ হয়ে থাকুন কিন্তু তার সুদরীকে অপরেও সুন্দর বলুক, এমনি একটা গোয়াতুমি যেন তাকে পেয়ে না বসে, এই আমাদের প্রার্থনা।
সংস্কৃতি মানে জীবনের values** সম্বন্ধে ধারণা। ধর্মের মতো মতবাদ বা আদর্শও তা ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই সে সম্বন্ধে সাবধান হওয়ার দরকার। অতীতে ধর্ম ঈশ্বরকে আচ্ছন্ন করেছিল, বর্তমানে মতবাদ বা আদর্শ মনুষ্যত্বকে আচ্ছন্ন করতে পারে। লোকটা মোটের উপর ভালো কি মন্দ সেদিকে আমাদের নজর নেই, তার গায়ে কোন দলের মাকা পড়েছে সেদিকেই আমাদের লক্ষ্য। মাকাটি নিজের দলের হলে তার সাত খুন মাফ, না হলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার দোষ বের করা আমাদের স্বভাবে দাড়িয়ে গেছে। এই মনোবৃত্তি থেকে মুক্তি না পেলে কালচার্ড হওয়া যায় না। মনে রাখা দরকার, ধর্মের সমস্ত দোষ মতবাদের ঘাড়ে এসে চেপেছে। মতবাদী ধামিকের মতোই অসহিষ্ণু ও সঙ্কীর্ণ, ধর্মিকের মতোই দলবদ্ধতায় মতবাদীর সহায় বিজ্ঞান। আমি আমার জন্য নিষ্ঠুর হচ্ছি না, পৃথিবী-উন্নয়নের বিজ্ঞানসম্মত আদর্শের জন্যই নিষ্ঠুর হচ্ছি। অতএব এখানে আমার গৌরব নিহিত, কলঙ্ক নয়। নিষ্ঠুরতাব্যাপারে এই যুক্তিই মতবাদীর আত্মসমর্থনের উপায়।
সৌভাগ্যের বিষয় সত্যিকার এর কিছুদিন পরে আমার এক ধাৰ্মিক বন্ধুকে বললাম : দেখুন তো খ্রিস্টান পাদরিরা কী সুদর কথা বলেন, আমাদের মৌলবী সাহেবদের তো এমন সুদর কথা বলতে শোনা যায় না। উত্তরে বন্ধুটি বললেন : বোকা কোথাকার, ওদের পাদরিদের যে কালচার আছে। আমাদের মৌলবী সাহেবদের তা কোথায়? ব্যস, আমার বোকামির পুরস্কারটি হাতে হাতে পেয়ে গেলাম : কালচারই যে সৌন্দর্যের কারণ, অন্যকিছু নয়, তা প্রমাণিত হয়ে গেল।
অনেকে বলেন হায়ার ভালু, কিন্তু হায়ার ভালু বলে কোনো কথা থাকা উচিত নয়। কেননা, ভ্যালু জিনিসটা নিজেই একটা ‘হায়ার কিছু সুতরাং হায়ার কথাটা ফাজিল, অতিরিক্ত।
সংস্কৃতিকামীরা কখনো মতবাদী হতে চায় না, মতবাদকে তারা যমের মতো ভয় করে। কেননা, তাদের কাজ বাইরের থেকে কোনো দর্শন গ্রহণ করা নয়, বহু বেদনায় নিজের ভিতর থেকে একটা জীবনদর্শনের জন্ম দেওয়া, এবং দিন দিন তাকে উন্নতির পথে চালনা করা।
আইডিয়ার গোড়ামি থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় নিজের বা নিজের দলের অভ্রান্ততা সম্বন্ধে একটুখানি সন্দেহ রাখা। এই সন্দেহটুকুই মানুষকে সুন্দর করে তোলে, আর সৌন্দর্যই সংস্কৃতির লক্ষ্য। স্কেপটিসিজমের প্রভাব না থাকলে-যে সভ্যতা সৃষ্টি হতে পারে না, এ-তো একরকম অবিসংবাদিত সত্য। মনে রাখা দরকার, সংস্কৃতিবান হওয়ার কোনো ধরাবাধা পথ নেই, বিচিত্র পথ। কার জন্য কোন পথটি সার্থক কে বলবে? সেকালে বলা হত যত জীব, তত শিব একালে বলা যেতে পারে যত সংস্কৃতিবান মানুষ তত সংস্কৃতি-পন্থা। যে-পথটি ধরে মানুষ কালচার্ড হয় তা অলক্ষ্য না হলেও দুলক্ষ্য। তা পরে আবিষ্কার করা যায়, আগে নয়। তাই সংস্কৃতিবান মানুষটি একটা অলাদা মানুষ, স্বতন্ত্র সত্তা। তার জীবনের একটি আলাদা স্বাদ, আলাদা ব্যঞ্জনা থাকে। সে মতবাদীর মতো বুলি আওড়ায় না, তার প্রতিকথায় আত্মা স্পদিত হয়ে ওঠে। প্রেমের ব্যাপারে, সৌন্দর্যের ব্যাপারে, এমনকি সাধারণত ধর্মীয় কল্যাণের ব্যাপারেও তার আত্মার ঝলকানি দেখতে পাওয়া যায়। নিজের পথটি নিজেই তৈরি করে নেয় বলে সে নিজেই নিজের নবী হয়ে দাড়ায়। তাই সে স্বাতন্ত্র্যধর্মী, গোলে হরিবোলের জগতে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কল্যাণের ব্যাপারে সাম্যকে স্বীকার করলেও প্রেমের ব্যাপারে, সৌন্দর্যের ব্যাপারে, চিন্তার ব্যাপারে সে স্বাতন্ত্র্য তথা বৈচিত্র্যের পক্ষপাতী। সত্যকার সংস্কৃতিকামীরা নিজেদের ছাচে ঢালাই করতে চায় না। নকল যিশু, নকল বুদ্ধ, নকল মার্ক্স বা নকল লেনিন হওয়া তাদের মনঃপূত নয়। ক্ষুদ্র হলেও তারা খাটি কিছু হতে চায়!
কিন্তু পথের বিভিন্নতা থাকলেও তাদের লক্ষ্যের সাম্য রয়েছে—সকলেই অমৃত তথা আত্মাকে চায়. যিশুখ্রিস্ট যখন বলেন : For what is man profited if he shall gain the whole world, and lose his own soul ?-তখন সংস্কৃতিকামীর অন্তরের কথাই বলেন। এই খ্রিস্টবাণীরই ঔপনিষদিক ভাবান্তর হচ্ছে যেনাহং নামৃতা স্যাংকিমহং তেন কুর্যাম—যা দিয়ে আমি অমৃত লাভ করব না তা দিয়ে আমি কী করব? অমৃতকে কামনা, তথা প্রেমকে কামনা, সৌন্দর্যকে কামনা, উচ্চতর জীবনকে কামনা, এই তো সংস্কৃতি। এইজন্য সংস্কৃতিকে একটা আলাদা ধর্ম, উচ্চস্তরের ধর্ম বলা হয়েছে। প্রাণিজীবনের উর্ধ্বে যে-জীবন রয়েছে তার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়ে, এবং তার দ্বারা প্রাণিজীবনকে খণ্ডিত করে দিয়ে, তা মানুষের অন্তরে মুক্তির স্বাদ নিয়ে আসে। তাই বলে প্রাণিজীবনের তথা ক্ষুৎপিপাসার মূল্য যে তা দেউ না তা নয়। খুবই দেয়। Man does not live by bread alone – এই কথাটির মধ্যেই ক্ষুৎপিপাসার স্বীকৃতি রয়েছে। তবে মর্যাদাভেদ আছে যা নিয়ে বাচা যায়, আর যার জন্য র্বাচতে হয়, তা কখনো এক মর্যাদা পেতে পারে না। তাই সংস্কৃতিকামীদের ইচ্ছা : ক্ষুৎপিপাসার জগৎটি তৈরি করা হোক ক্ষুৎপিপাসার উর্ধ্বে যে-জগৎটি রয়েছে তারই পানে লক্ষ্য রেখে। নইলে সংস্কৃতি ব্যাহত হবে। সংস্কৃতিকামীরা আরো কামনা করে : ক্ষুৎপিপাসার জগৎ তথা কল্যাণের জগৎ নির্মাণে লক্ষ্যের চেয়ে উপায়কে যেন কম বড় স্থান দেওয়া না হয়। কেননা, উপায়ই চরিত্রের স্রষ্টা, লক্ষ্য নয়। একবার একরকম চরিত্র সৃষ্টি হয়ে গেলে পরে তার থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।
হিমালয়ের চূড়ায় চূড়ায় যে ধনধারা আবদ্ধ হয়ে আছে, ভগীরথের মতো সমতলভূমিতে নামিয়ে এনে তাকে সাধারণের ভোগের বস্তু করতে না পারলে জগতের মুক্তি নেই—এ-কথা স্বীকার করলেও, এই একটি সুরই সংস্কৃতিকামীদের জীবনে বেজে ওঠে না, সঙ্গে সঙ্গে রর সমারোহ দেখা দেয়। একসুরা, একঝোকা জীবন যে দীন জীবন, তা তারা জানে। বিভিন্ন, এমনকি বিপরীত সুরের চমকে সিম্ফনি সৃষ্টি করতে না পারলে তারা খুশি হয় না। তাদের জীবনবীণাটি একতারা নয়, বহুতারসমন্বিত। তাই একত্ববাদে তাদের এত আপত্তি। একত্ববাদী তথা মতবাদীরা অনেক সময় সূক্ষ্ম তারগুলিকে আমলই দিতে চায় না, অথচ প্রকৃত সংস্কৃতিকামীদের নজর সে-দিকেই। মতবাদীর সবচেয়ে বড় ক্রটি এই যে, একটি আদর্শের আলোকে সমস্ত কিছু দেখতে চায় বলে সে অবজেকটিভ তথা তন্ময় হতে পারে না। অবজেকটিভ হতে হলে নিজেকে লুকোতে হয়। মতবাদী, নিজেকে, তথা নিজের মতটিকে লুকোতে পারে না বলে বিচিত্র ভাব ও অনুভূতির আগার মানুষের মর্মে গিয়ে পৌছতে পারে না। সে কেবল নিজের মতবাদটিকেই খোজে, বারে বারে ফিরে ফিরে তার সেই এক কথা। বিভিন্ন ব্যাপারকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে, এমনকি একটি ব্যাপারকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে না জানলে—যে জীবন দরিদ্র থেকে যায় তা সে বোঝে না। আদর্শের গোড়ামির দরুন সে বৈচিত্র্যবোধ তথা জীবনবোধ হারিয়ে বসে। তাই কান পাততে নয়, মুখ খুলতেই সে পটু। অথচ কান পাতাতেই সংস্কৃতি, মুখ খোলাতে নয়। কান পাতার ফলে যখন লোকের মনের বিচিত্র ভাব ও অনুভূতি এসে আপনার অন্তরকে অজ্ঞাতসারে ভরে তোলে, তখনই আপনি অভাবিতের দেখা পান। মুখ খুললে শুধু ভাবিতের প্রকাশ। মতবাদী কান পাততে জানে না বলে অন্তরের দিক দিয়ে মরে যায়, যদিও হইচই করে বলে ভাবে, সে-ই সবচেয়ে বেশি বেঁচে আছে। প্রবলভাবে বাচা বাচা নয়, মৃত্যু। প্রচুরভাবে, গভীরভাবে বাচাই বাচা—সংস্কৃতিকামীই এ-সত্য উপলব্ধি করতে পারে। মতবাদ ঝড়ের মতো এসে জীবনের সমস্ত মুকুল ঝরিয়ে দেয়। সংস্কৃতি ঠিক তার উল্টো, দখিন হাওয়ার মতো জীবনের সমস্ত ফুল ফুটিয়ে তোলাই তার কাজ। তখন কত রং, কত বৈচিত্র্য, কত সৌন্দর্য। একসুরা, একরঙা জীবন মতবাদীর সংস্কৃতিকামীর নয়। সংস্কৃতিসাধনা বহুভঙ্গিম জীবনের সাধনা। Let us agree to differ—ভিন্নরুচিৰ্হি লোকঃ—এই উক্তিতে মতবাদীর আস্থা কম। অথচ সংস্কৃতিকামীর কাছে এরচেয়ে শ্রদ্ধেয় বাণী আর নেই।
সাধারণ লোকের কাছে প্রগতি আর সভ্যতার কোনো পার্থক্য নেই। যা সভ্যতা তা-ই প্রগতি, অথবা যা প্রগতি তা-ই সভ্যতা। কিন্তু কালচার্ড লোকেরা তা স্বীকার করে না। উভয়ের সূক্ষ্ম পার্থক্য সম্বন্ধে তারা সচেতন। প্রগতি তাদের কাছে মোটের উপর জ্ঞানের ব্যাপার। কেননা, জ্ঞানের ক্ষেত্রেই পরিবর্তনশীলতা অবধারিত, সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে নয়। তাই জ্ঞান, বিশেষ করে বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানপ্রসূত কল্যাণকেই তারা প্রগতি মনে করে। প্রকৃতিবিজয়লব্ধ সমৃদ্ধির সার্থক বিতরণই তাদের কাছে প্রগতি। কিন্তু সভ্যতা শুধু প্রগতি নয়, আরো কিছু। প্রগতির সঙ্গে সৌন্দর্যের সম্বন্ধ, প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপিত না হলে সভ্যতা হয় না। আর সৌন্দর্য ও প্রেমের ব্যাপারটা তথা শিলেপর ব্যাপারটা—কেননা শিলপ, সৌন্দর্য ও প্রেমেরই অভিব্যক্তি—চিরন্তন ব্যাপার, প্রগতির ব্যাপার নয়। এ-সম্বন্ধে গিলবার্ট মারের উক্তি উল্লেখযোগ্য: Doubtless there is in every art an element of knowledge or science, and that element is progressive. But there is another element, too, which does not depend on knowledge and which does not progress but has a kind of stationary and eternal value, like the beauty of the dawn, or the love of a mother for her child, or the joy of a young animal in being alive, or the courage of a martyr facing torment. We cannot, for all our progress, get beyond these things; there they stand, like light upon the mountains. The only question is whether we can rise to them. And it is the same with all the greatest births of imagination—চিরন্তনকে স্পর্শ করতে না পারলে সভ্যতা সৃষ্টি করা যায় না। কেননা, সভ্যতা ভ্যালুর ব্যাপার, আজ নিউভালু বলে কোনো চিজ নেই। জীবনে সোনা ফলাতে হলে প্রগতিকে চলতে হবে সভ্যতার দিকে মুখ করে, নইলে তার কাছ থেকে বড়কিছু পাওয়া যাবে না। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আজকাল প্রগতি কথাটা যত্রতত্র শুনতে পাওয়া গেলেও সভ্যতা কথাটা একরকম নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। লোকেরা কেবল প্রগতি-প্রগতি করে, সভ্যতার নামটিও কেউ মুখে আনে না।
অনেকে সংস্কারমুক্তিকেই সংস্কৃতি মনে করে, উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পায় না। কিন্তু তা সত্য নয়। সংস্কারমুক্তি সংস্কৃতির একটি শর্ত মাত্র। তাও অনিবার্য শর্ত নয়। অনিবার্য শর্ত হচ্ছে মূল্যবোধ। সংস্কার-মুক্তি ছাড়াও সংস্কৃতি হতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ ছাড়া সংস্কৃতি অসম্ভব। মূল্যবোধহীন সংস্কারমুক্তির চেয়ে কুসংস্কারও ভালো। শিশোদর-পরায়ণতার মতো মন্দ সংস্কার আর কী হতে পারে? অর্থগুধুতাও তাই—কিন্তু এসব মূল্যবোধহীন সংস্কারমুক্তিরই ফল। তাই শুধু সংস্কারমুক্তির ওপরে আস্থা স্থাপন করে থাকা যায় না। আরো কিছু দরকার। কামের চেয়ে প্রেম বড়, ভোগের চেয়ে উপভোগ— এ-সংস্কার না জমালে সংস্কৃতি হয় না। সূক্ষ্ম জীবনের প্রতি টান সংস্কৃতির জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু মূল্যবোধহীন সংস্কারমুক্তির টান সে-দিকে নয়, তা স্কুল জীবনেরই ভক্ত।
সংক্ষেপে সুন্দর করে, কবিতার মতো করে বলতে গেলে সংস্কৃতি মানে সুদরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাচা, প্রকৃতি-সংসার ও মানব-সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির নয়নজলে, মহতের জীবনদানে বাচা, গল্পকাহিনীর মারফতে, নরনারীর বিচিত্র সুখ-দুঃখে বাঁচা, ভ্রমণকাহিনীর মারফতে, বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে বাচা; ইতিহাসের মারফতে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে বাঁচ; জীবন কাহিনীর মারফতে দুঃখীজনের দুঃখ নিবারণের অঙ্গীকারে বাচা। বাচা, বাচা, বাচা। প্রচুরভাবে, গভীরভাবে বাচা। বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে বাচা।
সংস্কৃতিবান মানুষ সমাজের কল্যাণ কামনা করে এবং সেজন্য প্রাণপাত করতেও প্রস্তুত থাকে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চায় সে নিজের জীবনে সোনা ফলাতে। কেননা, সেখানে তার অবাধ অধিকার। তাই জগৎকে মেরামত করার চেয়ে নিজেকে শোধরানোর দিকেই তার অধিক বোক। তার সমুখ দিয়ে কে যেন সর্বদা গান গেয়ে যায় :
মন তুমি কৃষি-কাজ জানো না,
এমন মানব-জনম রইল পতিত
আবাদ করলে ফলত সোনা।
জীবনে সোনা ফলাতে হলে যে-জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় তা হচ্ছে সত্তকীর্ণ ব্যক্তিত্বমুক্ত হয়ে বিচিত্র জীবনধারণার সঙ্গে যোগযুক্ত হওয়া—নিজেকে বিশ্বের পানে মেলে ধরা, সঙ্কুচিত ও সঙ্কীর্ণ করে রাখা নয়। কবির যে প্রার্থনা—যুক্ত করহে সবার সঙ্গে, মুক্ত করহে বন্ধ—তাতে সংস্কৃতিকামনাই ব্যক্ত হয়েছে। সকলের সঙ্গে যুক্ত হওয়াতে মুক্তি সকলের থেকে আলাদা হয়ে, সঙ্কুচিত হয়ে, কূর্মের মতো আত্মগত হয়ে থাকা মুক্তি নয়—বন্ধন। জীবনে জীবন যোগ করা, নহিলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা, এই উক্তিটিও একই কামনার অভিব্যক্তি। পার্থক্য কেবল, ওখানে বাধনটা চাওয়া হয়েছে নিজের দিকে তাকিয়ে এবং নিজের জন্য, এখানে সকলের দিকে তাকিয়ে এবং সকলের জন্য। বাঁধন, বাধন, বাধন। সকলের সঙ্গে বাধন পরাতেই সমৃদ্ধি, ধরণীর পরে শিথিল বাধন ঝলমল প্রাণ করিস যাপন—শিথিল বাধন না হলে ঝলমল প্রাণ লাভ করা যায় না। আর ঝলমল প্রাণ লাভ করাই সংস্কৃতির উদ্দেশ্য।
শিথিল বাধনের অন্তরায় বলেই সংস্কৃতিকামীরা উগ্র জাতীয়তাকে এত ভয় করে। সব দেশে তাদের যে-ঘরটি রয়েছে, সেই ঘরটি তারা খুঁজে নিতে চায়। সকল দেশের, সকল জাতির, সকল কালের লোকই তাদের আত্মীয়। তারা বিশ্বনাগরিক অনাত্নীয়তা, মানুষকে আপন না-জানা, ধর্ম বা মতবাদের বিভিন্নতার জন্য মানুষকে পর ভাবা সংস্কৃতির মনঃপূত নয়। কেননা, সংস্কৃতি মানেই অহমিকামুক্তি। অহমিকার গুমটভরা অন্ধকারে সংস্কৃতিকামীর স্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে। অহঙ্কার পতনের মূল কি না তা সে বলতে পারে না, কিন্তু তা-যে আনন্দের অন্তরায় সে-সম্বন্ধে সে সম্পূর্ণ সচেতন। অহঙ্কারী হওয়ার মানে নিজের চারদিকে বেড়া দিয়ে মানুষকে পর করা, আর মানুষকে পর করা মানে আনন্দকে পর করা। মানুষে-মানুষে মিলনেই আনন্দের জন্ম, বিরোধে নয়। বিরোধ আনন্দের শত্রু।
সংস্কৃতিসাধনা মানে ripe হওয়ার সাধনা। সেজন্য জ্ঞানের প্রয়োজন আছে, বিজ্ঞানের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রেমের। সংস্কৃতিবান হওয়ার মানে প্রেমবান হওয়া। প্রেমের তাগিদে বিচিত্র জীবনধারায় যে স্নাত হয়নি সে তো অসংস্কৃত। তার গায়ে প্রাকৃত জীবনের কটুগন্ধ লেগে রয়েছে তা অসহ্য। ‘সবার পরশে-পবিত্র করা তীৰ্থ-নীরে স্নাত না হলে সংস্কৃতিবান হওয়া যায় না।