প্রবন্ধধর্মনিরপেক্ষতা | অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা

ধর্মনিরপেক্ষতা | অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা

ধর্মনিরপেক্ষতা | অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা

১৯৭২ সালের ১৯, ২০, ২১ আগস্ট তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে শেরে বাংলা ফজলুল হক হল মিলনায়তনে ধর্মনিরপেক্ষতার উপর তিন দিনব্যাপী এক আলোচনা চক্রের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শিরোনামে আলোচ্য প্রবন্ধটি পাঠ করেন। ১৯৭৩ সালে আলী আনোয়ার সম্পাদিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বইয়ে প্রবন্ধটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বিচার করে এই প্রবন্ধের বক্তব্য আজও প্রাসঙ্গিক এবং সেটা বিবেচনা করেই আমরা আমাদের সাইটে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র অনলাইন ভার্সন প্রকাশ করলাম।


 

ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে কিছু বলা আমার পক্ষে সংগত কিনা এ প্রশ্ন আমাকে বিব্রত করে। ব্যক্তিগতভাবে কোন প্রথাবদ্ধ ধর্মেই আমার কোন আস্থা নেই, এবং প্রচলিত অর্থে ঈশ্বর আমার কাছে একটা ভ্রান্তি অথবা অবান্তর উপদ্রব বলে মনে হয়। এ অবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা সম্বন্ধে আমার বক্তব্য একপেশে হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আমি অস্বীকার করিনে। তবে এ বিষয়ে আমি সচেতন যে, আমার অস্তিত্ব উপেক্ষা করেই চারপাশের জনসমষ্টি আপন প্রবণতায় চলে, অথবা আপন ইচ্ছায় বসে থাকে। যদিও জনগণের ধর্ম বিমােচন এক কল্যাণকর অবস্থা বলে মানি, তবু বাস্তবে তার ব্যাপক সংগঠনে বিশ্বাসী হওয়া যে ক্যানিউটের সমুদ্র-শাসনে প্রয়াসী হওয়ার মতই নির্বোধ ও হাস্যকর তা আমার পছন্দসই না হলেও আমি স্বীকার না করে পারিনে। আর ধর্মনিরপেক্ষতা যতটা বিষয়ীনির্ভর, তার চেয়ে অনেক বেশী বিষয়নির্ভর বলেই আমি মনে করি।

কিন্তু বাস্তবে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যে কি বােঝায়, এ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে অনেক। প্রত্যেকেই নিজের মতাে করে এক একটা মানে খাড়া করি এবং তাতেই ইচ্ছা হলে বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করি। একজনের ধারণা অন্যজনের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত হতে পারে। তবু যেহেতু বিষয়টি বিস্ফোরক এবং সমস্যাকে পাশ কাটানাের পথ প্রশস্ত ও সুবিধাজনক, তাই এ নিয়ে বিতর্কের ভিতরে না গিয়ে নানা রকম গোঁজামিলের জগাখিচুড়িকে মেনে নেওয়াই আমরা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করি -ধর্মনিরপেক্ষতার অপব্যাখ্যা যদি আসর জাঁকিয়ে বসে, তবুও। সাচ্চা ঝুটা, সব রকম ধারণায় নিরপেক্ষ থাকা বােধহয় ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়। কিন্তু, এ কথা মানলেই আবার এক বিপজ্জনক অবস্থায় আমাদের পিছলে পড়ার সম্ভাবনা। ধর্মনিরপেক্ষতা সম্বন্ধে বিপরীত ধারণার সহাবস্থান অযৌক্তিক হলে ধর্ম সম্পর্কে বিপরীত ধারণার সহাবস্থান যুক্তিসংগত হয় কি? দ্বিতীয়টিকে মানলে প্রথমটির যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তােলার অধিকার আমাদের বিনষ্ট হয়। এবং তা হলে ধর্মনিরপেক্ষতার সঠিক মানে খোঁজা নিতান্তই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তবু যেহেতু ধরে নিই, চিন্তায় নৈরাজ্য ও কর্মে বিশৃঙ্খলা সামগ্রিকভাবে গণজীবনে ক্ষতিকর, তাই ধর্মনিরপেক্ষতার একটা সংগত ও গ্রহণযােগ্য ব্যাখ্যা অন্বেষণ একেবারে অর্থহীন মনে হয় না।

এখানে অবশ্য একটা কথা বলা প্রয়ােজন, ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি যে শুধু আমাদেরই তা নয়। ভারত গত পঁচিশ বছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষতাকে তাদের অন্যতম রাষ্ট্রীয় নীতি বলে ঘােষণা করে আসছে। অথচ সেখানেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে এ বিষয়ে ধারণা অস্বচ্ছই রয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নেহরু রাষ্ট্ৰীয় কার্যাবলী থেকে ধর্মকে বাদ দেওয়াই সংগত মনে করতেন, জাতীয় জীবনেও প্রথাবদ্ধ সব ধর্মের প্রতি উদাসীন থাকাই তার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হতাে। অথচ সে দেশেই দার্শনিক রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণ ঘােষণা করেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, এবং Hindu view of life এর কল্পিত ভাববাদী পূর্ণতায় তিনি আস্থাবান। সে দেশের সংবিধান ঈশ্বরবর্জিত; কিন্তু সংবিধানের রক্ষকদের অনেকেই জাতীয় পরিষদে শপথ নেন ঈশ্বরেরই নামে। পাশ্চাত্যের অনেক ‘আলােকপ্রাপ্ত’ দেশের রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধেও কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকা প্রয়ােজনীয় বলে বিবেচিত হয়। ইংল্যাণ্ডের অধিপতি গীর্জারও রক্ষাকর্তা, এবং প্রােটেস্টান্ট সম্প্রদায় বহির্ভূত কাউকে তার বিয়ে করার অধিকার রাজকীয় অনুশাসনে নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইবেল হাতে শপথ করে রাষ্ট্রীয় কার্যভার গ্রহণ করেন, এবং জার্মানিতে অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নাম ক্রিশ্চান ডেমোক্রেটিক পার্টি।

এ সব দেখে শুনে আমাদের বিভ্রান্তি বাড়ে বই কমে না, প্রশ্ন ওঠে, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ কি তবে অন্যত্রও উপেক্ষিত? না কি ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে এমন কিছু বােঝায়, যাতে রাষ্ট্রীয় বিধানে বিশেষ ধর্মের প্রতি অথবা সাধারণভাবে ধর্ম বা ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য কোন আপত্তিকর বিষয় বলে বিবেচিত হয় না।

এ কথা হয়ত আমরা ভুলে যাই যে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ একটা তৈরী করা প্রতিশব্দ। উক্তি ও উপলব্ধির গরমিলের সম্ভাবনা তাই একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইউরােপে সেকুলারিজম হঠাৎ একদিন দিনক্ষণ বেঁধে চালু করা হয়নি। জীবনের প্রয়ােজনে তা ক্রমশঃ জীবনকে অঙ্গীকার করার প্রয়াস পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাই মানুষ সচেতন ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা না করেও ঐতিহ্য লালিত হয়ে ও অভ্যাসবশে ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে পড়েন। যদিও এটাকে ইউরােপীয় জীবনের সার্বিক সত্য বলে ধরে নেওয়া ভুল হবে, তবুও সেখানে যে বাস্তব অবস্থা সমাজে সেকুলারিজম -এর প্রকাশ স্বাভাবিক ও অনিবার্য করেছে, তার প্রবণতা ও প্রতিক্রিয়াতেই হয়ত তার অর্থ ধীরে ধীরে একটা স্পষ্টতর রূপ লাভ করে চলেছে। ধ্রুবক হিসেবে শব্দটির ব্যবহার তাই, মনে হয়, অসমীচীন ও বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে।

ইউরােপে মানুষের ধারণায় ও ক্রিয়াকলাপে সেকুলারিজম, নিশ্চিত ভাবে রূপ পেতে থাকে রেনেসাঁর সময় থেকে। প্রকৃত পক্ষে তখন থেকেই ইউরােপে আধুনিকতার সূত্রপাত। ধর্মীয় অনুশাসনকে উপেক্ষা করে কিছু মানুষ, মানুষ হিসেবে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেন। যদিও গীর্জাতন্ত্র ও স্কলাসটিক ধ্যানধারনা একেবারে উঠে যায় না, তবু সেই চতুর্দশ পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই মানবমুখী মনােভাব সেখানে আর ঠেকিয়ে রাখা সহজ হয় না। পেত্রার্ক, ভাল্লা, দ্য ভিঞ্চি, শেক্সপীয়র এদের সবার চিন্তা ও কীর্তি সমকালীন খৃষ্ট ধর্মের নিরানন্দ জগতের ভিত্তিভূমিতে আঘাত হানে। দার্শনিক ব্রুনাে ধর্মের পাণ্ডাদের হাতে বন্দী ও পরে নিহত হন; কিন্তু তাঁর বাস্তববাদী দর্শন ধর্মীয় সংকীর্ণতার প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে নােতুন চিন্তার পথ উন্মুক্ত করে। কোন পারলৌকিক প্রত্যাশা নয়, জাগতিক সুখ-দুঃখের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাই নব যুগের চিন্তানায়কদের বেশী করে আকর্ষণ করে, তাঁদের চিন্তা ও কর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষ পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় এই রেনেসাঁর মানব-মুক্তি প্রয়াস তৎকালীন গীর্জা-কেন্দ্রিক ধর্মের গোঁড়ামিকে উপেক্ষা করেই পরিচালিত হয়। সেকুলারিজম বলতে এখানে তাই সব ধর্মের সহাবস্থান বােঝায় না। সে ধরনের সমস্যাকে সামনে রেখে রেনেসাঁর উদ্ভব ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, মন্ত্র-তন্ত্র ইত্যাদির দম-বন্ধ-করা পরিবেশ থেকে মানুষের চিন্তা ও কর্মকে মুক্তি দিয়ে জাগতিক সকল বিষয়ে তাকে উৎসাহিত করতেই সেকুলারিজম, -এর প্রকাশ নিশ্চিত হতে থাকে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, ধর্মীয় অনুশাসনে নয়, আপন আপন ঐশ্বর্যের বলেই তখন থেকে ইউরােপে দাঁড়াবার সুযােগ পায়।

অবশ্য এই রেনেসাঁ কোন আকস্মিক ঘটনা নয়, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাপক সম্ভাবনার পথে সামন্তবাদ ও গীর্জার প্রভুত্ব বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ধর্মের সামাজিক চাহিদা পূরণের ক্ষমতা ভিতরে ভিতরে লুপ্ত হতে থাকে; যদিও সব মানুষ সে সময়ে এ বিষয়ে পুরােপুরি সচেতন থাকে না। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কাছে ধর্মকে প্রকৃত পক্ষে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করে তার বাইরের খােলসে যদিও ঠাট বজায় রাখার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় আরো কিছুকাল।

তবে একথা অস্বীকার করা চলে না যে, রেনেসাঁ সব মানুষের, এমন কি অধিক সংখ্যক মানুষেরও, আন্দোলন ছিলাে না। ব্যক্তি ও সমাজ জীবন জটিল ও বহুমাত্রিক। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে তাদের অবস্থান সম্ভব। ইউরোপে রেনেসাঁ পর্বেও এই রকম চিন্তায় ও কর্মে নানা স্তর এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তীব্র অন্তঃবিরোধ বর্তমান ছিলো। ধর্মের পাণ্ডাদের উৎপীড়ন থেকে রেহাই পাননি ব্রুনাে অথবা গ্যালিলিও। এবং এই উৎপীড়নে সামগ্রিকভাবে সমাজের সমর্থন মােটেই অকিঞ্চিৎকর ছিল না। যে বতিচেল্লি রঙে রেখায় ধর্মবিমুক্ত শুদ্ধ সুন্দরের উপাসনা করেন, তিনিই পরিণতিতে ধর্মান্ধ সার্ভেনরোলার প্রবল চরিত্রের পদ প্রান্তে আপনাকে সমর্পণ করে নিশ্চিত হন। তবে যেটা উল্লেখযোগ্য তা হলো, কালের যাত্রার ধ্বনি অল্প সংখ্যক কিছু মানুষের কানে এক সময়ে বাজে, এবং আপন আপন সুবিশাল কীর্তি দিয়ে সেই যাত্রায় তারা প্রচণ্ড বেগ আনেন। কালের যাত্রায় যা জ্বালানির কাজ করে, তা সমাজবহিঃর্ভূত কোন অলৌকিক শক্তি নয়, তা স্বয়ম্ভুও নয়। আজকের ইউরােপ তার কাজে ও ভাবনায় সে সময়ের সব প্রবণতাকেই স্বীকার করে, যদিও সেকুলার ভাবনার প্রয়ােগই ব্যক্তি ও সমাজজীবনে অনেক বেশী ব্যাপক।

একটা কথা এখানে বােধহয় অপ্রাসংগিক হবে না যে, প্রাক-রেনেসাঁ যুগে যে অঞ্চল সেকুলার জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থল ছিলো, তা ইউরােপ নয়, আরব ভূখণ্ড। ইবনে রুশদ, ইবনে সিনা, ইবনে খালদুন প্রমুখ মনীষীর মুক্তচিন্তা, সে যুগেও গোঁড়া মােল্লাদের মনঃপূত হয়নি। বস্তুবাদে আস্থা স্থাপন বা গােষ্ঠী চেতনায় ইতিহাসের পথ অম্বেষণ অবশ্যই ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী। পরবর্তীকালে, ইউরাপীয় রেনেসাঁর কোন কোন স্মরণীয় ব্যক্তির মত ওই আরব মনীষীদের অনেককে দুঃখ বরণ করতে হয়েছে। তবু এটা লক্ষণীয় যে, মুক্তচিন্তার একটা পরিবেশ মুসলিম ও অমুসলিম মনীষীদের চিন্তার বিনিময় ও তার সমৃদ্ধি সহজ ও স্বাভাবিক করে তুলছিলাে। ব্যাপক অর্থে মানবিক মূল্যবােধে আস্থা, সহনশীলতা ও জ্ঞানচর্চা সমাজের উন্নততর অংশে স্বীকৃত ও শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠার সুযােগ পাচ্ছিলাে। কিন্তু সব পণ্ড করে দিলো ক্রুসেড। শত শত বৎসরের দীর্ঘস্থায়ী ধর্মযুদ্ধ মুসলমানদের মুক্ত মানসিকতা প্রসারের আর সুযােগ দেয় না, জেহাদের তিক্ততা ও যুদ্ধের উন্মাদনা তাদের ক্রমশ: আত্মকেন্দ্রিক করে তুলতে থাকে। নোতুন চিন্তার অবকাশ অথবা নােতুন করে সত্যান্বেষণের ইচ্ছা তাদের ধীরে ধীরে ক্ষয় পায়। ক্রুসেডের অবসানে তাই তারা হয়ে পড়ে জীর্ণ ও অন্তঃসারশূন্য। তাদেরই জ্ঞানকে আহরণ করে রেনেসাঁর নায়করা যখন নতুন সম্ভাবনার পথে পা বাড়ান তখন আরব জগৎ ধর্মান্ধতার খােলস পরে অপরিসীম অহংকারে কূপমণ্ডুকতাকে আত্মরক্ষার পরম পথ বলে বেছে নেয়। ইতিহাসে ‘যদি’র কোন স্থান নেই জানি, তবু ক্ষোভের সঙ্গে একটা কথা না ভেবে পারিনে, কুসেডের সর্বনাশা দহন যদি ওভাবে না পােড়াতাে, তবে রেনেসাঁ ও আনুষঙ্গিক সেকুলার চিন্তার প্রথম ফসল হয়ত ঘরে উঠতাে আরব জগতেই, এবং তা ঘটতো ইউরােপীয় রেনেসাঁর কয়েকশ বছর আগেই।

যাই হােক, ইউরােপে ধর্মের খুঁটি থেকে মুক্তিতে যে আধুনিকতার শুরু, তা সামন্ততন্ত্রকে পঙ্গু করে ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধনতন্ত্র ও শিল্প বিপ্লবের পথে পরিশেষে সমাজবাদের দিকে ধাবিত হয়। অর্থনৈতিক প্রয়ােজনের সঙ্গে তাল রাখতে ধর্মকেও পরিবর্তন মেনে নিতে হয়। মার্টিন লুথারের সংস্কার ও প্রােটেষ্টান্ট মতবাদের অভ্যুদয় গীর্জার আধিপত্য ও পাণ্ডাপুরুতদের দৌরাত্ম্য বিশেষভাবে খর্ব করে। দলীয় চেতনার ধারক হিসেবে ধর্ম ক্রমেই গুরুত্ব হারাতে থাকে এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সামাজিক স্থিতিবিধানে এখনও প্রয়ােজনীয় মনে হলেও উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে তাদের কেউ আর চিহ্নিত করে না। অবশ্য এ থেকে এমন ধারণা করা অনুচিত যে মানুষ সেখানে ধর্মের আশ্রয়কে পুরােপুরি পরিত্যাগ করার জন্যে মনের দিক থেকে প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতেও নিরীশ্বরবাদী হলবাক, যিনি ঘােষণা করেন, অজ্ঞানতা, ভয় ও প্রবঞ্চনা থেকে ধর্মের উদ্ভব, তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই The System of Nature বিচলিত সংস্কারবােধ ও অন্ধ আবেগতাড়িত জনসাধারণের যুক্তিহীন আক্রোশে খােলা রাস্তায় পােড়ানাে হয়। সংস্কার ও প্রতিক্রিয়ার এই ধারা সমাজদেহে এখনও একবারে হীনবল নয়। তবে যা স্মর্তব্য, তা হলো আজকের মানুষের উন্নয়ন স্পৃহা এই সংস্কার ও প্রতিক্রিয়ায় ব্যাহত হয়, স্বকালে লাঞ্ছিত সক্রেটিস, গ্যালিলিও অথবা হলবাকের মত মনীষীদের কীর্তিই আধুনিক মানুষের চিন্তার ভিত্তিভূমি রচনা করে।

সেকুলারিজম বহু শতাব্দী ধরে যেভাবে আচরিত ও রূপান্তরিত হয়ে আসছে, আজ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে যদি তারই ঠিক বঙ্গানুবাদ বলে ধরে নিই, তবে শুধুমাত্র সব ধর্মের সহাবস্থানেই তার অর্থ পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এ কথা সত্য যে ধর্মনিরপেক্ষতায় তার প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়, ধর্ম থেকে চিন্তার মুক্তিতেই ধর্মনিরপেক্ষতা পূর্ণতা পায়।

যে দেশে একাধিক ধর্মের মানুষ একত্রে বসবাস করে, সেখানে রাষ্ট্রীয় বিধানে সর্বধর্মের সহাবস্থান মেনে নেওয়ায় হয়ত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মেলে, কিন্তু তাতেই দেশের সব মানুষ চিন্তায় ও কর্মে ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে ওঠ না।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিসমূহ যদি গণ্ডি ছাড়াবার প্রেরণা না জোগায় তবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের আপন আপন বৃত্তে একসঙ্গে মুখ গুজে পড়ে থাকা সম্ভব ও স্বাভাবিক। বুদ্ধির মুক্তি তাতে ঘটেনা, এবং সাম্প্রদায়িকতার বিস্ফোরণ যে কোন সময়ে সমাজে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ভারতীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বীকৃতি আছে সত্য; কিন্তু তা থেকে এটা বলা চলে না যে সাম্প্রদায়িকতা সে দেশে কোন সমস্যার সৃষ্টি করে না। ধর্মের গণ্ডি ভাঙার প্রবণতা এখনও সে দেশে শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেনি, এবং তা না হলে প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা দূরের জিনিসই রয়ে যাবে।

তবে প্রথাবদ্ধ, ধর্ম শাসিত, গােষ্ঠি জীবনের সংস্কার যেখানে প্রবল, সেখানে সমাজকে উন্নত পর্যায়ে টেনে তােলায় ব্যক্তির দায়িত্ব কতটুকু? তার করণীয়ই বা কি? একক প্রচেষ্টায় ব্যক্তি সমাজকে কোন বিশেষ দিকে চালিত করতে পারে, এ ধারণা ভ্রান্ত। প্রগতিমুখী শক্তিগুলো যদি সমাজের ভেতর গড়ে না ওঠে, এবং সমাজের মানুষ যদি সেই শক্তির প্রকাশকে স্বীকার করে নিতে কুণ্ঠিত থাকে, তবে কিছু সংখ্যক ব্যক্তির আন্তরিক প্রয়াসও গণজীবনের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্নই থাকে। আবার উল্টো দিকে এ কথাও সত্য যে, যে কোন প্রগতি আন্দোলনই স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির পৃথক পৃথক, কিন্তু একাভিমুখী, অথবা সংঘবদ্ধ চেষ্টার ফলে রূপ পায়। আসল কথা হলাে, সমাজের অভ্যন্তরে প্রগতির শক্তি ও লক্ষণগুলােকে ঠিক ভাবে চেনা ও তাদের সঠিক প্রকাশে সহায়তা করা। তাৎক্ষণিক ফল না মিললেও পরিণতিতে তা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ইউরােপে রেনেসাঁর ক্ষেত্রে তা ঘটেছে। রেনেসাঁ পরবর্তী অনেক প্রগতি আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাই। পথিকৃৎদের যে প্রায়ই দুর্ভোগ সইতে হয় মানবজীবনের ধারায় একথার সত্যতা বারে বারে মেলে। সমাজে উন্নতির আকাঙ্ক্ষা যদি প্রবল হয় এবং প্রথাবদ্ধ ধর্ম যদি তার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তবে দুঃখভােগের সম্ভাবনা থাকলেও অন্তত কিছু সংখ্যক ব্যক্তির ধর্মকে উপেক্ষা করার সৎসাহস থাকা চাই। সমাজে উন্নয়নের প্রয়ােজন স্বীকৃত হলে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি সাধারণ মানুষের আক্রোশ দীর্ঘকাল স্থায়ী না হবারই সম্ভাবনা। সমাজ ব্যক্তিকে মূল্যবান মনে করতে পারে তখনই যখন প্রবহমান মানব ধারাকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে ব্যক্তিও যত্নবান হয়।

পরিশেষে একটি কথা বলে আমার বক্তব্যে সমাপ্তি টানি। প্রথাবদ্ধ কোন ধর্মেই আমার কোন আস্থা না থাকলেও আমার আপনজন যে কোন ধর্মে বিশ্বাসী হতে পারে। তার প্রতি আমার অনুরাগে তাতে বিন্দুমাত্র ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না।

নতুন লেখার নোটিফিকেশন পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

কপিরাইট সংক্রান্ত

এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা ভালো লাগলে, গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে, কিংবা অপছন্দ করলে নিজে বকা দিয়ে অন্যকে বকা দেয়ার সুযোগ করে দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন। লেখার শুরুতে এবং শেষে ফেসবুকসহ ডজনখানেক এপসে শেয়ার দেয়ার অপশন আছে। চাইলে কপি করেও শেয়ার দিতে পারেন। কিন্তু দয়া করে নিজের নামে অথবা জনাবা সংগৃহীত ভাইয়ের নামে, কিংবা মিস্টার কালেক্টেড এর নামে চালিয়ে দিবেন না। মূল লেখক এবং ওয়েবসাইটের নাম উল্লেখ করবেন। এবং দোহাই লাগে, এখান থেকে কপি করে নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবেন না।

মন্তব্য করুন