প্রায় ছয় মাস আগে চট্টগ্রামের ষোলশহরে ট্রাফিক বক্সে বোমা হামলার ঘটনায় পরিকল্পনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা দুবাইপ্রবাসী এক তরুণের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার চার আসামির একজনের আদালতে দেওয়া ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ থেকে এমন তথ্য মিলেছে বলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম শাখার কর্মকর্তারা জানান।
শাহজাহান নামে আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির বিষয়ে বিস্তারিত জানা না গেলেও তার বাবা লোহাগাড়ার পদুয়া ইউনিয়নের এক বাজারের মাংস বিক্রেতা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ষোলশহর ২ নম্বর গেইট ট্রাফিক বক্সের ওই বিস্ফোরণে দুই ট্রাফিক পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজন আহত হন। বিস্ফোরণে ট্রাফিক বক্সটিতে থাকা সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণের সুইচ বোর্ড ধ্বংস হয়। ঘটনার একদিন পর হামলার সঙ্গে আইএস যুক্ত বলে জঙ্গিবাদ পর্যবেক্ষণকারী সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ দাবি করে।
ওই ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় করা মামলার তদন্ত করছে নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এদের মধ্যে শাহেদ নামে (২০) এক কাঠমিস্ত্রিকে ২৭ জুলাই কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম সারোয়ার জাহানের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে পুলিশ বক্সে বোমা হামলা ও এর পৃষ্ঠপোষক দুবাইপ্রবাসী শাহজাহান নিয়ে বেশ কিছু তথ্য দেন বলে পুলিশের দাবি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আফতাব হোসেন বলেন, “জবানবন্দিতে শাহজাহান নামে দুবাই প্রবাসী একজনের কথা বলেছে শাহেদ, যিনি তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন। শাহজাহান বিদেশে থাকলেও তার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।”
শাহেদের স্বীকারোক্তির বরাতে পুলিশ বলছে, বেশ কয়েক বছর ধরে দুবাইয়ে থাকা শাহজাহান তার বোনের মৃত্যুর পর গত বছরের মাঝামাঝি দেশে আসেন। তিনি শাহেদকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করতেন; গান শুনতে নিষেধ করতেন। তার মোবাইলে কোনো গান পেলে তা মুছে দিতেন শাহজাহান।
গত বছর শবে বরাতে শাহেদের সঙ্গে জহির ও মোর্শেদ নামে দুইজনের পরিচয় করিয়ে দেন শাহজাহান। ওই জহির ও মোর্শেদ পুলিশ বক্সে বোমা হামলার অন্যতম নির্দেশদাতা বলে তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য।
কাউন্টার টেরোরিজম শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, ওই দুইজনই মোটর সাইকেলের সিকিউরিটি লক, বিভিন্ন ধরনের আইইডি ও সরঞ্জাম কিনে দিয়েছিলেন। তাদের এখনও ধরা যায়নি।
তারা তামীম আদনানী ও কাজী ইব্রাহীম নামে দুজনের ওয়াজ শোনার জন্য কিছু ভিডিও দিয়েছিলেন শাহেদকে। সেই ওয়াজ শুনে শাহেদের পাশাপাশি প্রতিবেশী দোকান কর্মচারী কায়সার ও আবু ছাদেকও ‘উগ্রবাদে উৎসাহী হন’।
শাহেদ পুলিশকে বলেছেন, প্রতি শুক্রবার ভোরে নামাজ পড়ে তারা মসজিদে আলোচনা করতেন। শাহজাহান বিভিন্ন সময়ে ফোন করে তাদের ডাকতেন। তারা না গেলে জহির ও মোর্শেদ তাদের মোটরসাইকেলে করে নিয়ে যেতেন। সেখানে বিভিন্ন ভিডিও দেখিয়ে তাদের ‘জিহাদে’ প্রলুব্ধ করা হত। আলাউদ্দিন, মহিউদ্দিন, হাবিব, সেলিম, কাইয়ুম নামে আরও কয়েকজন সেখানে থাকতেন।
গত বছর রমজানে শাহাজাহান দুবাই চলে গেলেও অপ্রচলিত বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে তাদের সবার সঙ্গে তার যোগাযোগ হত বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য।
বোমা হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শাহেদ জবানবন্দিতে বলেছেন, ২৭ ফেব্রুয়ারি সেলিম তার বন্ধু কায়সারকে ফোন করে পরদিন চট্টগ্রামে শহরে আসতে বলেন। সেলিমের নির্দেশে তারা পরদিন চট্টগ্রাম শহরে আসেন।
বেলা ১১টার দিকে শাহ আমানত সেতু এলাকায় সেলিমের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। রাস্তার পাশে একটি দোকানে নাস্তা করার সময় ছাদেক ও হাবিব একটি কার্টন নিয়ে দোকানে ঢোকেন। সেখান থেকে তারা একসঙ্গে ষোলশহর এলাকায় ইমরানের বাসায় যান। ওই কার্টনেই বোমা ছিল, যেটি পরদিন ছাদেক পুলিশ বক্সে রেখে আসেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আফতাব বলেন, “শাহেদ দুবাই প্রবাসী যে শাহজাহানের কথা বলেছেন সে বিষয়টি আমরা খোঁজ নিচ্ছি। এই মামলায় প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকা আরও কয়েকজন আসামি পলাতক আছে। তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে প্রবাসী শাহজাহান সম্পর্কে।”
এর আগে এই মামলায় গ্রেপ্তার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এমরানের জবানবন্দির বরাতে পুলিশ জানায়, পুলিশ বক্সে বোমা রেখে আসার পর ছাদেক টেলিফোনে তাকে জানায়। কীভাবে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বোমাটি বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে সে বিষয়ে সেলিম প্রশিক্ষণ দেয় তাকে।
তবে এমরানের দাবি, সে বোমাটি বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে তার বাসার সামনে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। পরে সাইফুল্লাহ সেটি খুঁজে নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটান।
মে মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ তিন জনকে গ্রেপ্তারের পর সিএমপি কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের তৎকালীন উপ-কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছিলেন, গ্রেপ্তার হওয়ারা সবাই নব্য জেএমবি’র সদস্য। ‘সেলফ মোটিভেটেড’ হয়ে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে।
“নিজেদের সংগঠনের আদর্শ ও শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন স্থানে দলগতভাবে তারা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। পুলিশকে তারা ‘তাগুত’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের অন্যতম শত্রু মনে করে। বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে তাই পুলিশ হত্যার চেষ্টা করে থাকে।”