ঠাকুরগাঁও বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের জমিরিয়া ইহ্ইয়াউল উলুম মাদ্রাসার এক শিক্ষকের নির্যাতনের কারণে এক শিক্ষার্থী মাদ্রাসা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

 

আহত ওই শিক্ষার্থীকে প্রথমে বালিয়াডাঙ্গি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে ঘটনার বিষয়টি আড়াল করতে আহত ওই শিক্ষার্থীকে সদর হাসপাতাল থেকে রিলিজ না করেই বর্তমানে বাসায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কাচনা গ্রামের চৌধুরী পাড়া এলাকার সাদেক আলী তার ছেলে শামীম আফজাল (১২)-কে কোরআনের হাফেজ করানোর জন্য আগষ্ট মাসে পার্শ্ববর্তী বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নে অবস্থিত জমিরিয়া ইহ্ইয়াউল উলুম মাদ্রাসায় হেফজো বিভাগে ভর্তি করে দেন। সেই থেকে ওই শিক্ষার্থীকে লেখাপড়ার নামে সময়ে অসময়ে নির্যাতন করা হতো। পড়া মুখস্ত রাখতে না পারায় তার উপর নির্যাতন করত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি শরিফুল ইসলাম। এ অবস্থায় ওই শিক্ষার্থী বাড়িতে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলে কর্তৃপক্ষ তাকে চোখে চোখে রাখত।
এমন অবস্থায় সে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে। এরই মাঝে একদিন ওই শিক্ষার্থী মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাসায় চলে যায়। পরে বাসা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে বুঝিয়ে আবার মাদ্রাসায় নিয়ে আসা হয়। গত বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে তাকে বুঝিয়ে মাদ্রাসায় দিয়ে যায় তার পরিবার। বিকালে আছরের নামাজের পর শামীম আফজালকে অধ্যক্ষ তার রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করেন। সেখানে থেকে বের হয়ে সে মাদ্রাসার ভবনের ছাদ থেকে নিচে ঝাপ দেয়।

এসময় মাদ্রাসার শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় শামীমকে তাৎক্ষনিকভাবে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ভর্তি করা হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রাতেই ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আহত শামীম আফজালকে চিকিৎসা না করিয়ে হাসপাতাল থেকে রিলিজ না নিয়েই তার পরিবারকে চাপ দিয়ে দ্রুত বাসায় নিয়ে আসা হয়।

শিক্ষার্থীর পিতা সাদেক আলী বলেন, যেহেতু এটা ইসলামিক প্রতিষ্ঠান তাই আমি এটা নিয়ে কোন বাড়াবাড়ি করবো না।

শিক্ষার্থীর নানা মাওলানা নুরুল ইসলাম বলেন, বাচ্চাটিকে আমি সেখানে ভর্তি করেছিলাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই সে পালিয়ে আসে। পরদিন তাকে রাখতে গিয়ে মাদ্রাসার কতৃপক্ষকে বুঝিয়ে বলি আমার নাতী শামিমের উপর রাগ বা বকাঝকা করবেন না। এরপর সন্ধ্যায় খবর পাই আমার নাতি মাদ্রাসার ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। পরে আমি খবর নিয়ে জানতে পারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি শরিফুল ইসলাম আমার নাতির উপর অত্যাচার করেছেন।

এ বিষয়ে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শামিম আফজাল বলেন, আমি ২৪ পারা কোরআন মুখস্ত করে থাকলেও আমার সবকিছু নাকি ভুল। আর এই ভুলের অজুহাতে অধ্যক্ষ মুফতি শরিফুল ইসলাম আমাকে নির্যাতন করতো। আমি পালিয়ে বাড়িতে গেলে আমার বাবাকে বলে ‘আর এমন হবে না’। পরে আমার নানা আমাকে আবার সকালে রেখে গেলে বিকালে আছরের নামাজের পরে আমাকে অধ্যক্ষ তার রুমে ডেকে নিয়ে যায়। তিনি আমাকে বলেন-‘তুমি এই প্রতিষ্ঠানের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করেছ রাতে তোমার ব্যাবস্থা নেওয়া হবে’। এরপর ভয়ে আমি ছাদ থেকে লাফ দেই।

এ ব্যাপারে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম শিক্ষার্থীর ঝাপ দিয়ে পড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ওই শিক্ষার্থী আগষ্ট মাসে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। কিন্তু সে মাদ্রাসায় থাকতে আপত্তি করে আসছিল। তার ওই আত্মহত্যা চেষ্টার জন্য মাদরাসা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ।

এ ব্যাপারে বালিয়াডাঙ্গী থানার অফিসার্চ ইনচাজ (ওসি) হাবিবুল হক প্রধানের সাথে কথা বলার জন্য থানায় গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া তার মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি ফোন ধরেন নাই।

বালিয়াডাঙ্গি উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন বলেন, ওই মাদ্রাসার ঘটনাটি আমি শুনে হাসপাতালে শিক্ষার্থীকে দেখতে গিয়েছিলাম। করোনাকালীন প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকার কথা, কিভাবে খোলা রয়েছে তা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমানকে বলা হয়েছে।

বিডি প্রতিদিন

মন্তব্য করুন